Sunday, March 3, 2024
মূলপাতাঅন্যান্যনির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে অদুরদর্শিতা সহিংসতার কারণ

নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে অদুরদর্শিতা সহিংসতার কারণ

আলপনা বেগম

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্বাচনকে ঘিরে দেখা গেছে নির্বাচন পুর্ববর্তী পরবর্তী এবং চলাকালীন সময়ে নানা ঘটনা ঘটে থাকে। বিশেষ করে সংিসতার মতো ঘটনা। দলের ভেতরে কোন্দল থাকলেও সেটি নির্বাচনে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এছাড়াও ক্ষমতা একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে বা লাঠিচার্জে নানা ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটে থাকে। ফলে সমাজে অস্থিরতা নির্মুল হয় না। বরং এই ধরনের সহিংসতাগুলো প্রতিহিংসা হয়ে দিনে দিনে দানা বাধে। একটি ঘটনার প্রতিশোধ নিতে আরেকটি সময়ের জন্য অপেক্ষাও করে। ফলে মানুষের মাঝে আতংক থেকে যায়।
সাধারণ ভোটাররা যারা ভোট দেন, দেশ পরিচালনা করতে নেতা বাছাইয়ে, তারা আতঙ্কিত থাকেন। পর্যায়ক্রমে দিনে দিনে ভোটরদের সরব উপস্থিতে ভাটা পড়ে। এক সময় নির্বাচন একটি উৎসব থাকলেও বিগত সময় ধরে শুধু মাত্র ভোট দিতে হবে তাই দেয়। এমন হয়েছে পরিস্থিতি। আর এটির কয়েকটি কারণ পাওয়া গেছে। যেমন পছন্দের প্রার্থী না থাকা একটি বিষয়। আবার দেখা গেছে প্রার্থী বাছাইয়ে সমন্বয়হীন বা অদূরদশিতা থাকায় পেশী শক্তির ব্যবহার হচ্ছে বছর কয়েক ধরে। ফলে দেখা গেছে জাতীয় থেকে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত ভোটাররা ঝুঁকি নিতে চান না। অনেকেই ভাবেন ভোট দিতে গিয়ে নিজের কোন লাভ নেই।
উল্টো কোন ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে নিজের জীবনও যেতে পারে। এমন ভয় ভীতি থেকেও অনেকের ভোট প্রাদানে নিরোৎসাহিত হন। আবার এও দেখা গেছে, পারিবারিক বা জমিসহ নানা বিরোধ মাথা চারা দেয়। তখন নির্বাচনী ঢালে নানা ঘটনার উত্থান ঘটে।
এই জন্যে প্রার্থী বাছাই প্রতিটি দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়বলে মনে করেন সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে দলীয় এবং সামিজক ও সুশীল সমাজ। তারা মনে করেন প্রতিটি নির্বাচনে গ্রহণযোগ্য সম্পন্ন প্রার্থী থাকলে দলীয় কোন্দল যেমন হবে না তেমনি ভিন্ন ভিন্ন দলের মধ্যেও অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটবে না। সকলেই মানুষের ভোটকে বা মতামতকে প্রাধ্যান্য দেবেন। অন্যথায় ভোটারদেরকে প্রভাবিত করার ফলে দেখা গেছে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। সেইসাথে ভোটাররা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন।
বিগত নির্বাচন পর্যালোচনা করে পুলিশ, দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জেলা যুবলীগের সভাপতি স্বপন জোয়ারদার শহরের তেরীবাজার এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। ২০০৬ সনে নির্বাচন পূব নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবীতে লগি বৈঠা আন্দোলনকালে মোহনগঞ্জে আওয়ামীলীগের মীর কাশেমকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
২০১৬ সনে ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী হয়েছিলেন গোলাম আবু ইছাক। নির্বাচনের দিন ইছাকের ছোটভাই গোলাম আবু কাউসার পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়। ওই নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন আরেক আওয়ামীলীগ নেতা (বিদ্রোহী) আনারস প্রতিকের ছানোয়ারুজ্জামান জুসেফ।
শফিকুল ইসলাম তালুকদার, মুরিদা রহমান, জিয়াউল কবীরসহ বেশ কজন ভোটার মোটাদাগে বলেন প্রার্থী বাছাই জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে সবকটিতে অত্যন্ত জরুরী। যেকোন দলের জন্যই এটি প্রযোজ্য। যখনই এর ব্যত্যয় ঘটে সেটি ভোটার সহ সমাজে প্রভাব পড়ে। অশান্তির সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষেরও ভোটাধিকার প্রয়োগে বিঘœ ঘটে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেত্রকোনা জেলা কমিটির সহ সাধারন সম্পাদক কোহিনূর বেগম বলেন, আমি মনে করি যে কোন নির্বাচনেই যোগ্য, জনগনের কাছে গ্রহণযোগ্য, সৎ, স্বচ্ছ রাজৈতিক ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের বলিষ্ট অধিকারী ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয়া সকল রাজনৈতিক দলের উচিত। অর্থ ও শক্তির কাছে পরাজিত না হয়ে ব্যক্তির শিক্ষা, আদর্শ, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির কোন ব্যাক্তিকে যদি সকল দল মনোনয়ন দেয় তাহলে যোগ্য ও ভাল লোক নির্বাচিত হবে এবং সফল সংসদ গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে সোনার বাংলাদেশ তৈরিতে সহায়ক হবে যেমন সঠিক না হলে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি হবে। সেইসাথে সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী বলেন, প্রাথী বাছাই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথী বাছাইয়ে অদূরদর্শীতা নির্বাচনে সহিংসতা সংঘটিত হতে পারে। অদূরদর্শীতা থেকে আসতে পারে প্রার্থীদের প্রতি অপরাধ প্রবৃত্তি, মিথ্যা প্রচার, বৈধ তথ্য গোপন করা এবং বিভিন্ন প্রকার দ্ব›দ্ব সূচক কাজকর্ম। ফলে ঘটে যায় নানা ঘটনা। তিনি আরও বলেন, প্রাথীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং চরিত্র পরীক্ষা করা, নিরপেক্ষ ও বিশ্লেষণাত্মক মিডিয়া সংস্থা দ্বারা তথ্য প্রদান, এবং সকল প্রার্থীর সমান অধিকার এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শামছুর রহমান লিটন (ভিপি লিটন) জানান, দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়, আওয়ামীলীগের সকল নেতাকর্মী তা মেনে নেয়। এটা এই বড় রাজনৈতিক দলের নেতাদের বৈশিষ্ট। এই দলে সবাই এক হয়ে কাজ করে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, মহিলা দল কেন্দ্রীয় কমিটির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট ড. অরিফা জেসমিন নাহিন বলেন, অযোগ্য ব্যক্তির কাছে কোন বিশুদ্ধ ও মহৎ কাজ আশা করা যায় না, তারা সবসময়ই নিজের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করে। সার্বজনীনভাবে কাজ করার বদলে স্বজনপ্রীতিই তাদের কাছে গহণ যোগ্য হয়। আদর্শ বা নীতির বদলে অনৈতিক, অন্যায়, অবিচার, অপরাধে নিমজ্জিত হয় সমাজ। অযোগ্যতা, অজ্ঞতা, অদক্ষতার কারনে কোন কাজই অযোগ্য নেতারা সুচারুভাবে করতে সক্ষম হন না।
অযোগ্যরা অন্যের অধিকার খর্ব করে। নিজেদেকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য, জনগনের উপর স্টীম রোলার চালায়। হত্যা, গুম, অপহরন করতে ও তারা দ্বিধা বোধ করে না। ফলে এমন ব্যাক্তিদের যখন দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় তখন একটি বিশঋঙ্খলা ঘটে। মানুষের মনস্তাত্বিক দ¦ন্ধের সৃষ্টি হয়। এগুলো থেকেই নানা ধরনের সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে।
বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া আটপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য অসিম কুমার উকিল বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অতিথের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মনোনয়ন দেয়। তবে সহিংসতা আসলে একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট বলে উল্লেখ করেন। নির্বাচনকালে সহিংসতা ঘটে। ঘটেনা যে এমন কিন্তু না। এর জন্য মনোনয়ন দায়ী আমি মনে করি না। সেখানে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং সামজিক পেক্ষপটে ঘটলেও মাত্রা ছাড়িয়ে যায় না। পরবর্তীতেও অনেক সময় হয়। তবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা শক্ত থকালে সমস্যা হয় না। দেখা গেছে অবৈধ টাকার ছড়াছড়িতে এই সহিংসতা ত্বরান্বিত হয়। আবার রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হলেও হয়। তবে তিনি বলেন আসন্ন জাতীয় সংসদ দ্বাদশ নির্বাচনে এই সুযোগ নেই। এবার তেমনটা হবে না।
নেত্রকোনা জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক কমিটির (সুজন) সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক শ্যামলেন্দু পাল বলেন, যেকোন নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে যেমন বাণিজ্য হয়, তেমনি নির্বাচনের সময় হামলা এবং হানাহানির মত ঘটনা ঘটে। সঠিক প্রার্থী দিতে দলগুলো অনেক সময় ব্যর্থ হয়। পরে এই নিয়ে পক্ষ প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে যায়। খুনের মত ঘটনাও ঘটে অনেক সময়। সারা জীবন রাজনীতি করে যারা তাদের মধ্য থেকেই মনোনয়ন দেয়া উচিৎ। হাইব্রীডদের মনোনয়ন দিলেই যত অনাচার। কিন্তু হচ্ছে তাই। লবিং করে মনোনয়ন নেয়া হয় এবং দেয়া হয়। তখন দলগুলোতে দেখা দেয় বিপর্যয়।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. ফয়েজ আহমেদ বলেন, সহিংসতা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকে যেকোন নির্বাচন হোক। পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রæত ব্যবস্থা নেয়। আর সর্বোচ্চ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই মূলত মাঠে থাকে পুলিশ। পুলিশের দায়িত্ব হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বলেন, বৈধ প্রার্থী যারা আমাদের কাছে সকলেই সমান। নির্বাচনকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকে। আমাদের কাজ থাকে নির্বাচন পরিচালনা করা। তবে নির্বাচন কাজে বেঘাত ঘটালে নির্দেশ অনুযায়ী সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেয়।

বি.দ্র. সমষ্টি কর্তৃক আগস্ট মাসের ফেলোশিপের একটি রিপোর্ট।

এই বিভাগের আরও সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সর্বশেষ সংবাদ

Recent Comments