Thursday, October 6, 2022
মূলপাতানেত্রকোনার সংবাদকেন্দুয়া উপজেলানেত্রকোনার কেন্দুয়ায় সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে আলোচনায় ইউএনও ডিসির শোকজ নোটিশ

নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে আলোচনায় ইউএনও ডিসির শোকজ নোটিশ

সোহান আহমেদ:
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় দৈনিক সংবাদ প্রত্রিকার সাংবাদিক হুমায়ূন কবিরকে ‘মামলায় জড়ানোর হুমকি’ দেওয়ায় ঘটনায় কারণ দর্শানোর নোটিশসহ ইউএনওকে সতর্ক করেছেন জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিস।

এরইমধ্যে বিষয়টি সুরাহায় মঙ্গলবার দুপুরে কেন্দুয়া প্রেসক্লাবে একটি মত বিনমিয় সভায় ইউএনও মাহমুদা বেগম সাংবাদিকদের সাথে আলোচনার এক পর্যায়ে এমন আচরণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে নিশ্চিত করেন সাংবাদিক হুমায়ূন। এ সময় কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি এডভোকেট আব্দুল কাদির ভূইয়া, সম্পাদক লিয়াকত আলী চৌধুরীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

ইউএনও মাহমুদা বেগম বলেন, কোন বক্তব্য এডিট করে দিলে সেটি বিভ্রান্ত হয়। ফেইসবুকে দেয়ায় আমি ব্রিবত হই। সাংবাদিক যেটি দিয়েছেন সেটি ফেইসবুকে দেয়াটা দ্বায়িত্বশীলের কাজ নয়। তাদের ক্লাবে অন্য একটি মত বিনিময় অর্থাৎ আমি তাদের উপদেষ্টা হিসেবে কল্যাণ ট্রাস্টের সভা ছিলো। সেখানে সাংবাদিকদের সাথে কথা হয়েছে। তারা আমাকে বলেছেন অবচেতন নে কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখিত হয়েছেন। আমিও বলতে চাই এটি ভুল বোঝাবুঝির কিছু নেই। আমি সরকারের কাজ করতে গিয়ে রোষানলে পড়েছি। আর যেন সাংবাদিক এবং আমাকে বিভ্রান্ত হতে না হয় সেটি সবাইকে দেখার অনুরোধ করেন তিনি।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ জানান, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। কোন দ্বায়িত্বশীল পদে থেকে এমন বক্তব্য প্রদান সঠিক হয়নি। তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। কেন এমন বক্তব্যই দেবে এবং পরে সাংবাদিকের সাথে এমন আচরণ করবে।

জানা গেছে, সম্প্রতি উপজেলার বলাইশিমুল খেলার মাঠের পাশে দখল হয়ে থাকা উদ্ধারকৃত জমিতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের নির্মাণাধীন ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় ইউএনও মাহমুদা বেগমের আয়োজনে সংবাদ সম্মেলন করার একটি বক্তব্যের ভিডিও ব্যাক্তিগত ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছিলেন হুমায়ূন কবীর। তারপরই মোবাইল ফোনে ইউএনও ‘হুমকি’ দেয়ার একটি অডিও রেকর্ড সাংবাদিক সহ উর্ধত্বন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ জানান, ইউএনওকে সতর্ক করা হয়েছে। ইউএনওর এসব কথা বলা ঠিক হয়নি। আর তিনি এ ধরনের কথা বলতেও পারেন না। বিষয়টি এরই মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

তবে ঘটনা পরদিন ‘হুমকি’ দেওয়ার বিষয়ে ইউএনও মাহমুদা বেগম মোবাইলে সাংবাদিক নেতাদের কাছে উল্টো অভিযোগ তুলেন, হুমায়ূন প্রথম থেকেই এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন। নানা সময়ে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এসব স্ট্যাটাসের কমেন্টে অশালীন ও অশ্রাব্য কথাবার্তা লেখা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেননি তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে নানা সময়ে নানা বিষয়ে কথাবার্তা হয়।তিনি সেগুলোও ফেইসবুকে প্রচার করে দেন। অন্য সকল সাংবাদিকের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক।

সাংবাদিক হুমায়ূন কবীর বলেন, “আমি ইউএনও ম্যাডামের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশা করিনি। তিনি আমাকে হয়রানি করতেই মামলার হুমকি দিয়েছেন। আমি এই ঘটনার বিচার চাই।

আরও জানা গেছে, বলাইশিমুল মাঠে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রী উপহারের ঘর নির্মাণ নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে প্রশাসনের দ্বন্দ্ব চলছে। সেখানে পুলিশি প্রহরায় ঘরের নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যেই শনিবার ভোরে সেখানকার দুটি ঘরের চালে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বিকালে এ নিয়ে নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ইউএনও মাহমুদা বেগম। সেই সংবাদ সম্মেলনে ঘরে আগুন দেওয়ার জন্য বলাইশিমুল মাঠ রক্ষার আন্দোলনকারীদের তিনি দোষারোপ করেন। এর পেছনে স্থানীয় একজন সাবেক সংসদ সদস্য, একজন ‘মনোনয়ন প্রত্যাশী’ আওয়ামী লীগ নেতার ‘হাত’ রয়েছে বলেও গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে তিনি অভিযোগ করেন।

কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম এবং কেন্দুয়া থানার ওসি আলী হোসেন সে সময় মঞ্চে ছিলেন। ইউএনও মাহমুদা বেগম বলেন, “সরকারি দলের কিছু লোক, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বামদল সবাই মিলে দূরভীসন্ধিমূলক ষড়যন্ত্র করছে। আমরা প্রশাসন অনেক ধৈর্য্য ধরেছি। আর নয়। দরকার হলে পুরো বলাইশিমুল ইউনিয়নকে গ্রেপ্তার করব। এটা হল আমাদের সিদ্ধান্ত। কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেব না।

এই বক্তব্যের ভিডিওই নিজের ফেইসবুকে দিয়েছিলেন দৈনিক সংবাদের প্রতিনিধি ও কেন্দুয়া উপজেলা প্রেসক্লাবের সদস্য হুমায়ূন কবীর। তারপরই তিনি ইউএনওর ফোন পান বলে কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী চৌধুরী কাজল নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, শনিবার বিকালে ইউএনও উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি যা বলেছেন তার ভিডিও ধারণ করেন সাংবাদিক হুমায়ূন কবীর। পরে তিনি সেই ভিডিও নিজের ফেইসবুক পেইজে পোস্ট করেন। প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানে ইউএনওর দেওয়া বক্তব্য ভিডিও করেছেন এবং সাংবাদিক হিসেবে ফেইসবুকে দিয়েছেন, সেখানে সমস্যা কোথায়। কাজল আরো জানান, এ রকম দায়িত্বশীল পদে থেকে তিনি যে হুমকি দিয়েছেন তা ন্যক্কারজনক। আমরা তার প্রতিবাদ জানাই। প্রতিকার চাই।

এলাকাবাসী, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ জানায়, বলাইশিমুল গ্রামের একটি মাঠে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। গ্রামের মানুষদের একটি অংশ মাঠটি বেদখল হয়ে যাবে মর্মে রক্ষা দাবী তুলে অন্য কোথায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের দাবি তোলেন।

অপরদিকে উপজেলা প্রশাসন দাবি করে, বেদখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধার করে ঘর তৈরি করা হচ্ছে। মাঠের জায়গায় মাঠও থাকছে। বরং দর্ঘিদিন অরক্ষিত পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা মাঠের বাউন্ডারি করে দেয়া হচ্ছে। যাতে সুরক্ষিত থাকে।

এই দ্বন্দ্বের মধ্যে নির্মাণকাজের প্রস্তুতি জেনে এলাকাবাসী মাঠ রক্ষার দাবিতে গত ২৮ মে মাঠেই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। পরের দিন ২৯ মে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম, ইউএনও মাহমুদা বেগম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র আসাদুল হক ভূঁইয়া, ওসি আলী হোসেন মাঠে যান।

আন্দোলনকারী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় করে মাঠের পূর্ব-উত্তর পাশে ঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। ওইদিনই জায়গাটির মাপ দিয়ে ঘর নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করেন তারা। পরদিন ৩০ মে একদিকে ঘর নির্মাণের জন্য ইট, বালুসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী পাঠিয়ে কাজ শুরু করা হয়। অপরদিকে মাঠ রক্ষার দাবি নিয়ে প্রশাসনে বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন আন্দোলনকারীরা।

মামলার বাদী হন বলাইশিমুল গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান ম-লসহ আটজন। মামলায় বিবাদী করা হয় কেন্দুয়ার ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা প্রশাসককে। শুনানি শেষে আদালত মামলাটি খারিজ করে দিলে গ্রামবাসীদের একাংশ মাঠ রক্ষার দাবিতে আন্দোলন চালানোর ঘোষণা দেন। এরপর থেকে আন্দোলনকারীরা অন্তত পাঁচটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন।

ঢাকার শাহবাগেও ওই মাঠ রক্ষার সমর্থনে মানববন্ধন হয়। ৩০ জুন একদল দুর্বৃত্ত’ প্রকল্পে পাহারারত গ্রাম পুলিশকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নির্মাণাধীন ঘর ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়। এর আড়াই মাসের মাথায় ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

এই বিভাগের আরও সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

সর্বশেষ সংবাদ

Recent Comments